সিপিডি

উৎপাদন ঘাটতি না থাকলেও চালের দাম বাড়ার কারণ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট

বিশ্ববাজারে চালের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেলেও দেশের বাজারে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্ববাজারে চালের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেলেও দেশের বাজারে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। দেশে চাল উৎপাদনে ঘাটতি না থাকলেও দাম বাড়ার পেছনে উৎপাদন খরচ ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

গতকাল ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০২৫-২৬: নির্বাচনী বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

গবেষণার তথ্য উপস্থাপনকালে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দেশে চালের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩১ মিলিয়ন টন হলেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৪৪ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ উৎপাদনে কোনো ঘাটতি নেই। এর পরও চালের দাম বাড়ছে, যা বাজার ব্যবস্থাপনার বড় দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারে শক্তিশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় ভোক্তারা সুফল পাচ্ছেন না।’

তিনি আরো বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, কিন্তু দেশের বাজারে তার প্রভাব নেই। একই চিত্র চিনি ও ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে দাম না কমা বাজারে প্রতিযোগিতা ও নজরদারির অভাবকে স্পষ্ট করে।’

সিপিডির গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০২৩ সাল থেকে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলমান রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সেই গতি খুব ধীর। ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমলেও খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশে রয়ে গেছে। ফলে চালের মতো প্রধান খাদ্যপণ্যের দামের সঙ্গে অন্যান্য পণ্যের মূল্যস্ফীতির যোগসূত্র আরো দৃঢ় হচ্ছে।

সিপিডির মতে, বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না করা গেলে এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুফল দেশের ভোক্তারা পাবেন না। এজন্য চালসহ নিত্যপণ্যের বাজারে নজরদারি জোরদার করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সংস্থাটি।

নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরি উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বিনিয়োগ না বাড়লে বৈষম্য ও অস্থিরতা বাড়বে। সমাজে যদি ন্যায়সংগত সুযোগ না থাকে, তাহলে একদিকে বৈষম্য তৈরি হয়, অন্যদিকে অস্থিরতা দেখা দেয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে আন্দোলন হয়, তার পেছনেও এ বাস্তবতা কাজ করেছে। বাজারে চাকরি নেই, সরকারি চাকরিই একমাত্র ভরসা, সেখানেও কোটা–সংকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চ মূল্যস্ফীতি। সব মিলিয়ে মানুষের জীবনে প্রবল অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছিল। এ বাস্তবতায় অর্থনীতিতে যে বিনিয়োগের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে আমরা যদি বের হতে না পারি, তাহলে এ সমস্যাগুলো জিইয়ে থাকবে।’

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দেশী-বিদেশী ঋণের বোঝা বাড়ছে। জাতীয় বাজেটের প্রধান খাত এখন ঋণের সুদ পরিশোধ। এ চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তাই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়তে পারে, এমন ঝুঁকি আছে।’

তৈরি পোশাক খাতে ২০৩০ সালে কার্বন কর নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘জাতীয়ভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানোর যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছি সেটি আমরা আসলে পারছি না। কার্বন নির্গমন বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের রফতানিতেও বড় প্রভাব পড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন একটি নীতিমালা প্রয়োগ করেছে—কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট। তারা কার্বন ট্যাক্স বসাচ্ছে। কোনো একটি পণ্য উৎপাদনে কী পরিমাণ কার্বণ নিঃসরণ হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে। তারা ৬১টি পণ্য শনাক্ত করেছে, তার মধ্যে ছয়টি দিয়ে জানুয়ারিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে ২০৩০ সাল থেকে তৈরি পোশাক খাতেও এটি কার্যকর হবে। তাই তৈরি পোশাক খাতে কয়লার ব্যবহার না কমালে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত কার্বন কর দিতে হবে। এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।’

আরও